করোনায় শিশুদের উপসর্গ কিছুটা আলাদা

চীন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে, প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে কোভিড-১৯ রোগটি কম মারাত্মক। এমনকি প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে শিশুদের মধ্যে এর উপসর্গও কিছুটা আলাদা। কোভিড-১৯ আক্রান্ত শিশুদের জ্বর, কাশি না–ও হতে পারে। 

গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) এ বিষয়ে এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই গবেষণায় চীন থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের শিশুদের ক্ষেত্রে কোভিড-১৯ বৈশিষ্ট্য কেমন, তা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়নি। অল্প কিছু উপাত্ত নিয়ে প্রাথমিকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখ থেকে এপ্রিলের ২ তারিখ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৬০ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৫৭২ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে। ১৮ বছরের ওপরে রয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ১৮৮ জন। 

ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখ থেকে এপ্রিলের ২ তারিখ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৬০ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৫৭২ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে। ১৮ বছরের ওপরে রয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ১৮৮ জন।  Source: Prothom-alo

ভিয়েতনামে যে কারণে করোনায় মৃত্যু শূন্য ও আক্রান্ত কম

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির সর্বশেষ ৭ এপ্রিল মঙ্গলবার দেওয়া তথ্যমতে, ভিয়েতনামে করোনাভাইরাসে কোনো ব্যক্তি এখন পর্যন্ত মারা যায়নি। যেখানে এর প্রতিবেশী চীনসহ এশিয়ার দেশগুলোয় করোনায় আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু চিকিৎসক, সাধারণ মানুষ ও সরকারগুলো ভাবিয়ে তুলেছে, সেখানে ভিয়েতনাম কী করে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ করে রেখেছে এবং আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যু শূন্যের কোঠায় ধরে রেখেছে, সেটাই আশ্চর্যের।

গণমাধ্যমগুলোর তথ্যমতে, ভিয়েতনাম সরকারিভাবে স্বাস্থ্য খাতের বিনিয়োগ ও রোগের চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধ করার যে কর্মসূচি বহুদিন ধরে চর্চা করে আসছে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ সেটি বড় ঢাল হিসেবে কাজ করেছে। আর যখন করোনাভাইরাস বা ‘কোভিড–১৯’ দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়েনি, তার আগেই ভিয়েতনাম গোটা দেশটাই লকডাউন করে দিয়েছে। এতে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)র সর্বশেষ (৭ এপ্রিল মঙ্গলবার রাত আটটা) তথ্য অনুযায়ী ভিয়েতনামে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২৪৫। আর যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির তথ্য অনুযায়ী সংখ্যাটি ২৪৯। তবে উভয় সংস্থা বলছে, ভিয়েতনামে করোনা ভাইরাসে এখন পর্যন্ত কেউ মারা যায়নি। দেশটিতে ইতিমধ্যে ভাইরাস থেকে সুস্থ হয়েছেন ১২৩ জন।

চীনের উহান থেকে দেশে ফেরা ৬৬ বছর বয়সী এক ভিয়েতনামী প্রথম করোনাভাইরাসে শনাক্ত হন। আনুষ্ঠানিকভাবে ২৩ জানুয়ারি প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্তের খবর প্রকাশ করে ভিয়েতনাম সরকার। ওই দিন থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ‘কোভিড–১৯’ রোগীর সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ১৪ জনে। এর মধ্যে ২ জন চীনা নাগরিক ছাড়া বাকি সবাই ভিয়েতনামী।

ব্যাপক আকারে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে তখনই স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয় সরকার। পাশাপাশি করোনাভাইরাস নিয়ে ব্যাপক আকারে প্রচার করে সাধারণ মানুষের মধ্যে। কীভাবে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ে, কী করলে সুস্থ থাকবে, এটাই ছিল প্রচারের মূল্য বক্তব্য। এসবের পাশাপাশি দেশটির স্বাস্থ্য বিভাগ সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের খুঁজে খুঁজে বের করে পরীক্ষা করেছে।

তবে গত ২ মার্চ সর্বনাশটা ঘটায় দেশটির একজন প্রভাবশালী নারী ব্যবসায়ী। ইউরোপের তিনটি দেশ ঘুরে ওই ব্যবসায়ী ভিয়েতনামের হ্যানয় বিমানবন্দরের দায়িত্বরত কর্মচারীদের পরীক্ষা ফাঁকি দিয়ে ঢুকে পড়েন দেশে। বিমানবন্দরের পরীক্ষায় ফাঁকি দিলেও ভিয়েতনামের পুলিশ তাঁকে ঠিকই আটক করে। এরপর জানা যায়, তিনি করোনায় আক্রান্ত।

এরপর ভিয়েতনাম সরকার একটা বড় পদক্ষেপ নেয়। সেটি হলো, ওই নারী যে বিমানে এসেছিলেন, তার সব যাত্রীকে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়। তিনি যে রাস্তা দিয়ে গিয়েছিলেন, সেই রাস্তা জীবাণুমুক্ত করা হয়, সেই পথের ধারে বাস করা প্রত্যেককে পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু এত সব করার পরও আক্রান্তের সংখ্যা ১৭–তে ঠেকিয়ে রাখা যায়নি—সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ২৪৯ জনে।

ভিয়েতনামের স্বাস্থ্য বিভাগ মনে করে, যদি ইউরোপফেরত নারী যাত্রী বিমানবন্দরের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ফাঁকি না দিতেন, তাহলে আক্রান্তের সংখ্যা এত বাড়ত না। কারণ, তিনি যেসব স্থানে গেছেন, সেখানের সবাইকে পরীক্ষার মধ্যে আনলেও সবকিছু ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।

তবে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানের তুলনায় ভিয়েতনাম এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাস মোকাবিলায় যা করেছে, তা সারা দুনিয়ার জন্য অনুকরণীয়।

করোনাভাইরাসের কারণে পর্যটননির্ভর দেশটি আগামী তিন মাসেই ৫ দশমিক ৯ থেকে ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হারাবে। তারপরও মৃত্যু ও সংক্রমণ ঠেকিয়ে রাখাকেই দুনিয়া অন্য নজরে দেখছে। শুধু তা–ই নয় দেশটি কম দামে করোনা শনাক্তকরণ কিটও তৈরি করছে।


সূত্র: Prothom-alo.com

করোনা–আক্রান্তদের জন্য কয়েকটি টিপস

করোনাভাইরাস দিনকে দিন বিশ্বে ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। এ রোগের কারণে একে একে মৃত্যুর দুয়ারে গেছেন ১১ হাজারের বেশি মানুষ। মহামারি এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকেই। দেখা যাচ্ছে, এ রোগে দ্রুত আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধদের মধ্যেই বেশি। চীন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বৃদ্ধদের, বিশেষ করে যাঁরা দীর্ঘস্থায়ী চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাঁদের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এরই মধ্যে করোনায় সবচেয়ে বেশি মারা গেছেন বয়স্ক ব্যক্তিরাই।

বয়স্কদের মধ্যে দুর্বল প্রতিরোধক্ষমতা ও স্বাস্থ্যের অবনতির কারণে কোভিড–১৯ সহজেই তাঁদের আক্রান্ত করে। বৃদ্ধদের মধ্যে কোভিড-১৯ আক্রান্তের ঝুঁকিও বেশি। কেন বৃদ্ধরা এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, এর সঠিক কারণ কেউই এখন পর্যন্ত বলতে পারছেন না। এটা হতে পারে বয়সজনিত কারণে। কারণ, এ সময় রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অনেকটাই কমে যায়। এ জন্য তাঁরা কোনো রোগ বা জীবাণুর সঙ্গে লড়তে পারেন না।

৬৫ বছর বা এর ঊর্ধ্বে যাঁদের বয়স, তাঁদের ঝুঁকি বেশি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, হার্টের সমস্যা, ক্যানসার, হাঁপানির মতো সমস্যা থাকলে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রেও একইভাবে বিপজ্জনক করোনাভাইরাস।

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশেই বলা হয়েছে, ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সের ব্যক্তিরা, যাঁদের দৈহিক বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে, তাঁরা যেন জনসমাগম এলাকা এড়িয়ে চলেন। তাঁরা যেন বাড়িতে থাকেন। বয়স্কদের সাবধানে কীভাবে রাখবেন, এর জন্য কয়েকটি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে—

ওষুধসহ প্রয়োজনীয় জিনিস মজুত রাখা
দরকারি ওষুধ ও প্রয়োজনীয় জিনিস আগে থেকে কিনে বাসায় রাখতে হবে। বাসার বৃদ্ধরা দুর্বল ও দীর্ঘদিন অসুস্থ হলে আমেরিকার সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) সুপারিশ করেছে, বেশ কিছু সপ্তাহের ওষুধ ও অন্যান্য জিনিস বাড়িতেই যেন রাখা হয়। সিডিসি তাদের নাগরিকদের বলেছে, প্রয়োজনীয় খাদ্য, ওষুধ এবং অন্যান্য চিকিৎসা পণ্যের সরবরাহগুলো আগে থেকে মজুত করে রাখুন। প্রিয়জনদের কী কী ওষুধ প্রয়োজন, তার খেয়াল পরিবার যেন রাখে। বাসার বয়স্কদের দিকে একটু সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিন।

পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। ২০ সেকেন্ড ধরে নিজেদের হাত সাবান–পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। এই পরামর্শ করোনাভাইরাস সচেতনতার জন্য সবাই দিচ্ছেন। যদি হ্যান্ডওয়াশ-পানি না থাকে, সে ক্ষেত্রে স্যানিটাইজার দিয়েও হাত ভালোভাবে ঘষে নিতে হবে। বাড়ি ও কর্মক্ষেত্রের জায়গাও যেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে, এ বিষয়ে নিশ্চিত থাকতে হবে। নিয়মিত বাড়ি ও কাজের জায়গা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করুন। এমনকি ইলেকট্রনিকসের জিনিসগুলোও নিয়মিত পরিষ্কার করুন।

কোনো জিনিস শেয়ার নয়
যৌথ পরিবারে সবাই একসঙ্গে থাকেন। একেকজনের ঝুঁকি একেক ধরনের হতে পারে। এ রকম অবস্থায় সবারই ঝুঁকি রয়েছে বলেই ধরে নিতে হবে। একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, একই পরিবারে বৃদ্ধ ও শিশুরা থাকে। তাদের এই সময়ে বা মাঝেমধ্যে সর্দি-কাশি হয়। সে ক্ষেত্রে পরিবারের উচিত ব্যক্তিগত সব জিনিস এই মুহূর্তে আলাদা ব্যবহার করা। যেমন খাবার, পানির বোতল, বাসন-কোসন। প্রয়োজন হলে বাড়ির একটি আলাদা ঘরে অসুস্থ সদস্যকে রেখে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে আলাদা শৌচাগারের ব্যবস্থাও করলে আরও ভালো হয়।

অনেক বৃদ্ধই আছেন, যাঁরা একা একা থাকেন। সে ক্ষেত্রে কীভাবে তাঁরা নিজেদের যত্ন নেবেন, সে বিষয়ে আগে থেকে পরিকল্পনা করে নিতে হবে। ফোন বা ই–মেইল কীভাবে ব্যবহার করবেন, জরুরি ফোন নম্বর, চিকিৎসকের নম্বর সব যেন হাতের কাছে থাকে।

আতঙ্ক নয়, আলোচনা করুন
অযথা আতঙ্কিত না হয়ে কোভিড-১৯ সম্পর্কে প্রতিবেশী, পরিবার-স্বজনদের সঙ্গে নিয়ে আলোচনা করতে হবে। কেউ আক্রান্ত হলে আগাম প্রস্তুতি কী হবে, তা নিয়ে পরিকল্পনা করে রাখুন। কোভিড-১৯ সম্পর্কে যতটা সম্ভব সচেতনতা বাড়াতে হবে, বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে এটা আরও প্রয়োজন। তাঁরা যাতে কোনোভাবেই বাড়ির বাইরে না বের হন, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বৃদ্ধদের আশ্বস্ত করুন যে এ রোগে ভয়ের কিছু নেই।

চিকিৎসকদের পরামর্শ মানুন
করোনা নিয়ে আতঙ্ক না বাড়িয়ে চিকিৎসক-বিশেষজ্ঞদের নির্দেশ মেনে চলাই শ্রেয়। কিছুদিন বৃদ্ধদের বাড়ির বাইরে বের হতে না দিয়ে বাড়িতেই রাখতে হবে। বিভিন্ন ধরনের ফিট থাকার শরীরচর্চা এই সময় তাঁরা করতে পারেন। স্বাস্থ্যকর খাবার এ সময় খুব প্রয়োজন। সর্দি-কাশি হলে তা এড়িয়ে না গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

করোনার ভয়ে বিশ্ববাসী রীতিমতো একঘরে হয়ে রয়েছেন। বিশ্বের অনেক দেশ তাদের শহরগুলো লকডাউন করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) নিজেদের ওয়েবসাইটে কোভিড-১৯ নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছে। সেখানে এ রোগের বিষয়ে সব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তথ্যসূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, সিএনএন